ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য, পরিশুদ্ধতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। মানুষের ফিতরাত, প্রবৃত্তি, মানসিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আল্লাহ নিকাহকে একটি পবিত্র, বৈধ ও কল্যাণময় বন্ধন হিসেবে দান করেছেন। শুধু মানবিক প্রয়োজন নয়—নিকাহ হলো রহমত, বরকত, সাকিনাহ (শান্তি) এবং ঈমান রক্ষা করার অন্যতম মাধ্যম। তাই ইসলাম বিবাহকে সুন্নত ঘোষণা করেছে এবং এটি দুনিয়া–আখিরাতের কল্যাণের দরজা।
নিকাহ: মানব জীবনের প্রশান্তি ও স্থিতির মাধ্যম
মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও একা থাকার জন্য সৃষ্টি হয়নি। মানুষের মধ্যে রয়েছে স্নেহ, ভালোবাসা, সঙ্গ, মানসিক আশ্রয় ও নিরাপত্তা লাভের প্রাকৃতিক চাহিদা। আল্লাহ মানুষের এই স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণের জন্য নিকাহকে নির্ধারণ করেছেন। বিবাহে একজন অন্যজনের জন্য হয় আশ্রয়, হৃদয়ের শান্তি, মানসিক স্বস্তি এবং জীবনের ভারসাম্যের কেন্দ্র।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন—
“তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই যুগল সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি (সাকিনাহ) লাভ করো।”
(আর-রূম ৩০:২১)
এখানে “সাকিনাহ” শব্দটি শুধু মানসিক প্রশান্তি নয়—এটি অন্তরের গভীর তুষ্টি, নিরাপত্তা, পরিপূর্ণতার অনুভূতি। আল্লাহ নিকাহের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) এবং দয়া (রহমাহ) স্থাপন করেছেন।
নিকাহ শুধু দেহের প্রয়োজন পূরণ নয়—এটি মানসিক ও আত্মিক ভারসাম্য তৈরি করে। একা থাকা মানুষের মাঝে থাকে ভয়, দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব, অস্থিরতা; কিন্তু পরিবার মানুষকে দেয় নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ ও স্থিরতা। সঠিক দাম্পত্য জীবনে মানুষ বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারে ইবাদতে, কাজে, ইতিবাচক চিন্তায় এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণে।
অন্যদিকে, ইসলামে ব্রহ্মচর্য বা আজীবন অবিবাহিত থাকা উত্সাহিত নয়, কারণ তা মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনের বিরোধী। হাদিসে এসেছে—
“নিকাহ আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।”(বুখারি)
সুতরাং নিকাহ জীবনের স্থিতি, মানসিক প্রশান্তি ও ফিতরাতের সম্পূর্ণতার পথ।
দাম্পত্যে আল্লাহর বরকত: কুরআন–হাদিসের আলোকে
বিবাহিত জীবনে এমন অনেক বরকত রয়েছে যা অবিবাহিত অবস্থায় পাওয়া যায় না। নিকাহ মানুষকে দেয় রিজিকের প্রশস্ততা, জীবনে স্বস্তি, পরিবারে সমৃদ্ধি এবং তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্ববোধ। কুরআনে বারবার দেখা যায়—আল্লাহ রিজিক ও বরকত বাড়ানোর জন্য পরিবার গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা গরিব হওয়ার ভয় করো না। আল্লাহ তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন।”
(আন-নিসা ৪:৩)
রাসুল ﷺ বলেন—
“তিন জন মানুষের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে নেন… (তাদের একজন হলো) যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চেয়ে বিবাহ করে।”
(তিরমিজি)
এখানে স্পষ্ট—নিকাহ দারিদ্র্য নয়; বরং বরকত ও রিজিক বৃদ্ধির মাধ্যম।
দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত নেমে আসে। দুই মুসলিম যখন পরিবার গঠন করে, তারা একে অপরকে নেক কাজে সহায়তা করে, যিনা–ব্যভিচার থেকে বাঁচে, খারাপ পরিবেশ থেকে দূরে থাকে।
তাছাড়া, স্বামী–স্ত্রী পরস্পরের জন্য “লিবাস” (পোশাক)—
“তোমরা তাদের জন্য পোশাক, আর তারা তোমাদের জন্য পোশাক।”
(বাকারা ২:১৮৭)
পোশাক যেমন ঢেকে রাখে, রক্ষা করে, সৌন্দর্য বাড়ায়—তেমনই স্বামী–স্ত্রী একে অপরকে রক্ষা করে, সমর্থন দেয়, দোষ ঢেকে দেয় এবং জীবনকে সৌন্দর্যময় করে।
দুই হৃদয়ের মিলনে সৃষ্টি হয় রহমতের দুয়ার
দুই মানুষ যখন আল্লাহর নামে নিকাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন শুধু চুক্তি হয় না—তাদের মাঝে আল্লাহ রহমতের দরজা খুলে দেন। নিকাহ মানুষের মাঝে ভালোবাসা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, সহানুভূতি, সহযোগিতা—এই সমস্ত মানসিক গুণাবলি বৃদ্ধি করে।
কুরআনে বলা হয়েছে—
“তিনিই তোমাদের মাঝে মাওয়াদ্দাহ ও রহমাহ সৃষ্টি করেছেন।”
(আর-রূম ৩০:২১)
এটি দেখায়—স্বামী–স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা মানবিক নয়, বরং এটি আল্লাহর দান। যখন দাম্পত্য সম্পর্ক আল্লাহর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তখন ঝগড়া হলেও দ্রুত মিটে যায়, মনোমালিন্য থাকলেও দয়া এসে ভর করে, কারণ আল্লাহ রহমত নাজিল করেন।
রাহমাহ বা দয়ার এই প্রকাশ দেখা যায়—
• পরস্পরের কষ্ট ভাগ করে নেওয়া
• ভুল হলে ক্ষমা করা
• দাম্পত্যে ধৈর্য ধারণ করা
• সন্তানের লালন–পালনে সহযোগিতা
• মানসিক সাপোর্ট দেওয়া
বিবাহহীন জীবনে মানুষ অনেক সময় আত্মিক দ্বন্দ্বে ভোগে, কিন্তু বিবাহ দয়া ও সহমর্মিতার মাধ্যমে জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে।
নিকাহ সমাজকে পবিত্রতার পথে পরিচালিত করে কেন
বিবাহ সমাজের পবিত্রতা ও নৈতিকতা রক্ষার প্রধান মাধ্যম। ইসলাম ব্যক্তিগত পবিত্রতার পাশাপাশি সমষ্টিগত নৈতিকতার উপর অত্যন্ত জোর দেয়। আধুনিক সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, ব্যভিচার, অবৈধ সম্পর্ক, লিভ–ইন ইত্যাদি অনৈতিক আচরণ পরিবার এবং সমাজকে ধ্বংস করছে।
আল্লাহ সতর্ক করেছেন—
“ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না।”
(বনি ইসরাইল ১৭:৩২)
নিকাহ ব্যভিচারের সকল দরজা বন্ধ করে মানুষের প্রবৃত্তিকে বৈধ পথে পরিচালিত করে।
বিবাহিত সমাজ—
✔️ নৈতিকভাবে সুস্থ
✔️ অপরাধ কম
✔️ পারিবারিক সহিংসতা কম
✔️ সন্তানরা নিরাপদ পরিবেশে বড় হয়
✔️ প্রজন্ম নৈতিক ও সুশিক্ষিত হয়
নিকাহ না থাকলে সমাজে জন্ম নেয়—
✘ অবৈধ সন্তান
✘ পরিবারহীন প্রজন্ম
✘ মানসিক সংকট
✘ অপরাধমুখী প্রবণতা
✘ যৌন অবক্ষয়
তাই ইসলাম বিবাহকে সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে দেখেছে।
বিবাহ: সুন্নত পালন ও ঈমানের পরিপূর্ণতা
বিবাহ শুধু দাম্পত্য সম্পর্ক নয়; এটি এমন একটি ইবাদত যা ঈমানকে পরিপূর্ণ করে।
হাদিসে রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে বিবাহ করল, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করল।”
(বায়হাকি)
এটি একটি গভীর অর্থবহ হাদিস। কারণ—
• নিকাহ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে
• পাপের দরজা বন্ধ করে
• পরিবার গঠনের মাধ্যমে মানুষ দায়িত্বশীল হয়
• দাম্পত্যে ধৈর্য, দয়া, ত্যাগ—এই গুণগুলো ঈমান বাড়ায়
এর বিপরীতে, অবিবাহিত জীবন অনেক ক্ষেত্রে শয়তানের প্রলোভনে ফেলে দিতে পারে। তাই সুন্নত অনুযায়ী বিবাহ ঈমানকে শক্তিশালী করে।
পারিবারিক বন্ধনে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ
পরিবার ইসলামি সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। পরিবার গঠনের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের জীবনে বিশেষ শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতি দান করেন। পরিবার থেকেই শিক্ষা, চরিত্র, নৈতিকতা ও সমাজ গড়ে ওঠে।
আল্লাহ বলেন—
“আল্লাহ তোমাদের ঘরবাড়িকে শান্তির আবাস করেছেন।”
(আন-নাহল ১৬:৮০)
পরিবার শুধু মানুষের শারীরিক চাহিদা পূরণ করে না। এটি পূরণ করে—
• মানসিক সমর্থন
• আত্মিক বিকাশ
• সামাজিক পরিচিতি
• সন্তান জন্মদান ও লালন–পালন
• দান–সদকা–নেক কাজের ভিত্তি
স্বামী–স্ত্রীর আদর্শ পারস্পরিক সম্পর্ক সমাজে শান্তি ছড়িয়ে দেয়। একটি পরিবার নষ্ট হলে শুধু স্বামী–স্ত্রীর নয়—সন্তান, সমাজ ও প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পরিবার আল্লাহর একটি বিশেষ নিঅমত।
নিকাহের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ
বিবাহ দুনিয়াতে শান্তি ও সুখ দেয়, আর আখিরাতে সওয়াব ও পুরস্কারের পথ খুলে দেয়।
স্বামী–স্ত্রীর প্রতিটি নেক কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। এমনকি স্বামী–স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার সম্পর্কও ইবাদত।
রাসুল ﷺ বলেন—
“তোমাদের প্রত্যেকে স্ত্রী–সংসারের জন্য ব্যয় করলে তা সদকা হবে।”
(মুসলিম)
অর্থাৎ—
• খাওয়ানো
• দেখাশোনা
• উপহার দেওয়া
• ভালো ব্যবহার
সবই সওয়াবের কারণ।
দাম্পত্যে ধৈর্যধারণ, ভুল ক্ষমা করা, সন্তানের দায়িত্ব পালন—এসব কাজের জন্যও বিপুল সওয়াব রয়েছে।
রাহমতের ঘর: স্বামী–স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতা
ইসলাম দাম্পত্যে পরস্পরের অধিকার–কর্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন অন্যজনের কাছে দায়বদ্ধ।
আল্লাহ বলেন—
“তাদের সাথে সদ্ব্যবহার কর।”
(নিসা ৪:১৯)
দায়িত্বগুলো হলো—
• আর্থিক দায়িত্ব (স্বামীর উপর)
• ভালো ব্যবহার
• একে অপরের ইজ্জত রক্ষা
• মানসিক সহায়তা
• যৌন অধিকার পূরণ
• দাম্পত্যে পরামর্শ–সহযোগিতা
এই দায়িত্বগুলো পালন করলেই সংসার হয় রাহমতের ঘর, আর দায়িত্বহীনতা সংসারকে ধ্বংস করে দেয়।
বিবাহ ও আত্মিক শান্তি: ইসলামের দৃষ্টিতে
দাম্পত্য জীবন মানুষকে দেয় আত্মিক শান্তি—
• ইবাদতের আগ্রহ বাড়ে
• মনোযোগ বৃদ্ধি পায়
• চরিত্র উন্নত হয়
• স্থিতিশীলতা আসে
আল্লাহ বলেন—
“তিনি তোমাদের মধ্যে সাকিনাহ নাযিল করেছেন।”
(ফাতহ ৪৮:৪)
বিবাহিত ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির যুদ্ধে থাকে না, ফলে দুনিয়া ও আখিরাতের কাজে মনোনিবেশ করতে পারে। আত্মিক উন্নয়ন হয়, গুনাহ কমে, ঈমান বাড়ে।
সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে নিকাহের ভূমিকা
সুস্থ সমাজের ভিত্তি হলো সুস্থ পরিবার। পরিবার গড়ে নিকাহের মাধ্যমে।
একটি নৈতিক সমাজ গঠন হয়—
• নৈতিক সন্তানের জন্ম
• দায়িত্বশীল নাগরিক
• অপরাধহীন পরিবেশ
• সুশিক্ষিত প্রজন্ম
হাদিসে এসেছে—
“সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম নারীদের সাথে বিবাহ করো, কারণ আমি তোমাদের সংখ্যায় গর্ব করব।”
(আবু দাউদ)
এটি দেখায়—মজবুত পরিবার থেকে মজবুত উম্মত জন্ম নেয়।
উপসংহার
নিকাহ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নয়—
✔️ এটি আল্লাহর রহমত
✔️ সুন্নত
✔️ পবিত্রতা
✔️ সাকিনাহ
✔️ বরকত
✔️ ঈমান পূর্ণতার পথ
দাম্পত্য জীবন সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়া–আখিরাতে সমৃদ্ধ হয়। ইসলাম নিকাহকে রহমত বলেছে কারণ এটি মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং আত্মিক জীবনে সম্পূর্ণ কল্যাণ বয়ে আনে।