উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার দোয়া, বিবাহ বার্ষিকী শুভেচ্ছা

 

ইসলাম ধর্মে বিবাহ হলো মানবজীবনের অন্যতম একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত

ইসলাম ধর্মে বিবাহ হলো মানবজীবনের অন্যতম একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে। অতএব, বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে”

(বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ৫৪৮৬)।

প্রতিটি মানুষেরই একটি সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবনের জন্য একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী প্রয়োজন। বর্তমান সমাজে সঠিক এবং নেককার মানুষ খুঁজে পাওয়া অনেক সময় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কোরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে জানব কীভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী চাওয়া যায় এবং দাম্পত্য জীবনকে কীভাবে ইসলামিক মূল্যবোধের মাধ্যমে আরও মধুময় করা যায়।

বিবাহ: ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিবাহকে তাঁর সুন্নাহর অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যে ব্যক্তি বিয়ে করতে সক্ষম, তার জন্য বিবাহ করা উচিত। নবী (সা.) বলেছেন:

النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي

"বিবাহ আমার সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৪৬ | ইমাম আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন — সহিহুল জামি: ৬৬৫৬

অতএব, বিবাহ থেকে বিরত থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য নয়। যে ব্যক্তি শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম তার উচিত দ্রুত বিয়ে করা।

ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনসঙ্গী ও তাকদির

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের বিয়ের বিষয়টি কি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ। 

হাদিস শরীফে এসেছে, আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টির তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৩)।

এই তাকদিরের মধ্যেই মানুষের রিযিক, হায়াত এবং জীবনসঙ্গীর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। তাই বলা যায়, পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই আপনার জীবনসঙ্গী নির্ধারিত। সুতরাং, বিয়েতে দেরি হলে হতাশ হওয়া উচিত নয়; বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করা এবং অবিরাম দোয়া করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

নেককার জীবনসঙ্গী লাভের আমল ও কোরআনি দোয়া

যারা উপযুক্ত বয়সে পৌঁছেছেন তারা প্রায়ই ওলামায়ে কেরামের কাছে দ্রুত বিয়ে ও উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার আমল সম্পর্কে জানতে চান। এর জন্য কোরআনে চমৎকার কিছু দোয়া শেখানো হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পঠিত উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার দোয়া হলো সূরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াত। আল্লাহ তায়ালা শিখিয়েছেন:

“رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا”

অর্থ: “হে আমাদের রব্ব! আমাদের স্ত্রীদের (বা স্বামীদের) এবং আমাদের সন্তুতিদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ স্বরূপ করুন।” (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)

এছাড়াও, হযরত মুসা (আ.) এর একটি দোয়া ওলামায়ে কেরামগণ আমল হিসেবে করতে বলেন, যা সূরা আল-কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে: "হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।"

অনেকে শরিয়াহ সম্মতভাবে পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার দোয়া করতে চান। যদি সেই ব্যক্তি দ্বীনদার হন, তবে আল্লাহর কাছে ইস্তিখারার নামাজের মাধ্যমে এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সময় দোয়া করা যেতে পারে। আল্লাহ যদি তাতে কল্যাণ রাখেন, তবে অবশ্যই তা সহজ করে দেবেন।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে দাম্পত্য জীবন

জীবনসঙ্গী নিয়ে কোরআনের আয়াত গুলো অত্যন্ত গভীর ও রোমান্টিক অর্থ বহন করে। 

সূরা আল-বাকারাহ এর ১৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা (স্বামীরা) তাদের পোশাক।”

পোশাক যেমন মানুষের দোষ ঢেকে রাখে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, স্বামী-স্ত্রীও ঠিক তেমনই একে অপরের পরিপূরক।

আবার সূরা আর-রুম এর ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্যই তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রীদেরকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”

দাম্পত্য জীবনের এই সৌন্দর্য নিয়ে অনেক ইসলামিক স্কলার চমৎকার সব কথা বলেছেন। আপনি যদি জীবনসঙ্গী নিয়ে ইসলামিক উক্তি বা সাধারণ জীবনসঙ্গী নিয়ে উক্তি খোঁজেন, তবে দেখবেন সবার কথার মূল নির্যাস হলো, পারস্পরিক সম্মান, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং অগাধ বিশ্বাসই হলো একটি সুন্দর সংসারের চাবিকাঠি। আজকাল অনেকেই তাদের সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় চমৎকার সব জীবনসঙ্গী নিয়ে ক্যাপশন ব্যবহার করেন, যা সম্পর্কের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।

বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা ও খুতবা

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ের আকদ বা চুক্তি হওয়ার ঠিক আগে একটি সুন্নাহ আমল হলো বিবাহের খুতবা প্রদান করা। এই খুতবায় হামদ ও সানা (আল্লাহর প্রশংসা) পাঠের পর সূরা আন-নিসা এর ১ নম্বর আয়াত, সূরা আল-ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াত এবং সূরা আল-আহযাবের ৭০-৭১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। এর মাধ্যমে বর-কনে উভয়কেই তাকওয়া বা আল্লাহভীতির উপদেশ দেওয়া হয়। এই বরকতময় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমেই সবাই নবদম্পতিকে শুভ বিবাহ জানিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করেন।

বিবাহ বার্ষিকী উদযাপন ও ইসলামিক শুভেচ্ছা

বিয়ের পর প্রতি বছর যখন বিয়ের তারিখটি ফিরে আসে, তখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন। অনেকেই আজকাল ফেসবুকে শেয়ার করার জন্য সুন্দর বিবাহ বার্ষিকী স্ট্যাটাস বাংলা বা সংক্ষেপে বিবাহ বার্ষিকী স্ট্যাটাস খুঁজে থাকেন।

স্বামীর বলতে পারে বা লিখতে পারে: কোনো স্ত্রী যদি দ্বীনি আবহে তার স্বামীকে শুভেচ্ছা জানাতে চান, তবে তিনি স্বামীকে বিবাহ বার্ষিকী শুভেচ্ছা ইসলামিক বার্তা হিসেবে লিখতে পারেন:

“হে আমার প্রিয় স্বামী, আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই পবিত্র বন্ধনকে জান্নাতুল ফেরদাউস পর্যন্ত কবুল করুন এবং আপনার রিযিক ও হায়াতে বরকত দান করুন।”

এছাড়া সাধারণ স্বামীকে বিবাহ বার্ষিকী শুভেচ্ছা হিসেবে বলা যায়: “আমার জীবনের সেরা উপহার হয়ে আসার জন্য আপনাকে শুকরিয়া।”

স্ত্রী বলতে পারে বা লিখতে পারে: একইভাবে, একজন স্বামীর উচিত তার স্ত্রীকে স্পেশাল অনুভব করানো। স্ত্রীকে বিবাহ বার্ষিকী ইসলামিক শুভেচ্ছা বার্তা হতে পারে এমন:

“হে আমার প্রিয় অর্ধাঙ্গিনী, আল্লাহ তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আমাদের এই ভালোবাসায় অশেষ রহমত নাযিল করুন।”

দুজনের জন্য: বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনরাও এই বিশেষ দিনে নবদম্পতিকে চমৎকার সব বিবাহ বার্ষিকী শুভেচ্ছা পাঠাতে পারেন। আর নিজেদের বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে নিজের বিবাহ বার্ষিকী ফেসবুক স্ট্যাটাস শেয়ার করেন, যেন সবাই তাদের জন্য দোয়া করতে পারে।

উপসংহার

বিয়ে শুধু দুটি মানুষের নয়, দুটি পরিবারের এক সুন্দর ও পবিত্র মিলন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে একজন নেককার ও চরিত্রবান জীবনসঙ্গী দান করুন। যারা অবিবাহিত, আল্লাহ তাদের অপেক্ষার প্রহরকে সুন্দর করুন এবং যারা বিবাহিত, আল্লাহ তাদের দাম্পত্য জীবনকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিন। আমিন।

Leave a Comment